শাড়িকাণ্ডে তানজিন তিশার বিরুদ্ধে বাদীর নারাজি আবেদন, ফের শুনানি ২০ অক্টোবর

আইন-আদালত
শাড়িকাণ্ডে তানজিন তিশার বিরুদ্ধে বাদীর নারাজি আবেদন, ফের শুনানি ২০ অক্টোবর

অভিনেত্রী তানজিন নাহার তিশা। ছবি: সংগৃহীত

৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩:০০ পিএম

প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও হুমকির অভিযোগে অভিনেত্রী তানজিন নাহার তিশার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় পুলিশের দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দিয়েছেন মামলার বাদী।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সেফাতুল্লাহের আদালতে এই আবেদন করেন বাদী। আবেদনের প্রেক্ষিতে বিচারক নারাজির বিষয়ে আংশিক শুনে বাদীকে সকল সাক্ষী হাজির করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং আগামী ২০ অক্টোবর শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী শুভ্র সিনহা রায় এ বিষয়ে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজির দরখাস্ত দেওয়া হয়েছে। বিচারক আংশিক শুনে সাক্ষীদের আগামী ২০ অক্টোবর হাজিরের নির্দেশ দিয়েছেন।

এর আগে গত বছরের ১০ মে পিবিআই এ মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাদী একজন ফ্যাশন ডিজাইনার এবং তার গুলশানের ১২৭ নম্বর রোডে একটি ফ্যাশন হাউজ ও স্টুডিও রয়েছে। অন্যদিকে তানজিন তিশা একজন মডেল ও অভিনেত্রী। বিভিন্ন ফ্যাশন ও অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে একসঙ্গে অংশ নেওয়ার সূত্রে দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর তানজিন তিশা একটি অনুষ্ঠানে পরার জন্য তার সাবেক ড্রাইভারের মাধ্যমে বাদীর কাছ থেকে একটি শাড়ি নেন। বাদীপক্ষের দাবি, শাড়িটির মূল্য ছিল ৭৫ হাজার টাকা এবং অনুষ্ঠান শেষে পরদিনই সেটি ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। তবে শাড়িটি আর ফেরত দেওয়া হয়নি বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

তদন্তে বলা হয়েছে, শাড়িটি ফেরত চেয়ে বাদী ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর তিশাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠান। তবে উভয়ের মেসেঞ্জার স্ক্রিনশট পর্যালোচনা করে তদন্ত কর্মকর্তা দেখতে পান, তিশা ওই বার্তাগুলো ‘সিন’ করেননি। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তিশা ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত ফেসবুক মেসেঞ্জার ব্যবহার করতেন না। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল বাদী তিশাকে পহেলা বৈশাখের শুভেচ্ছা জানান। ১৮ মে একটি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে দুজনের দেখা ও কুশল বিনিময়ও হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর তাদের মধ্যে ফ্যাশন হাউজের ট্রায়াল রুম, ব্যক্তিগত বিষয়সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা ও মনোমালিন্য তৈরি হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর বাদী আবার তিশাকে মেসেঞ্জারে শাড়িটি ফেরত দেওয়ার জন্য বার্তা দেন। সেখানে তিনি প্রায় এক বছর ধরে শাড়িটি ফেরত না পাওয়ার কথা উল্লেখ করে লোক পাঠিয়ে শাড়িটি ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করেন। জবাবে তিশা শাড়িটির বিষয়ে জানতে চান। বাদী তখন শাড়িটির ছবি পাঠান। পরে তিশা বাদীকে মেসেঞ্জারে কল করলেও বাদী তা রিসিভ করতে পারেননি। পরবর্তী কথোপকথনে তিশা শাড়িটির বিষয়টি মনে করতে পারছেন না এবং খুঁজে দেখে জানাবেন বলে জানান।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তিশা জানান, তার সাবেক ড্রাইভার শাড়িটি ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও সেটি ফেরত দেননি এবং ওই ড্রাইভার চাকরি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। এ সময় শাড়ি ফেরত দেওয়া নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এরপর ৭ নভেম্বর বাদী তিশাকে মেসেঞ্জারে ইংরেজিতে একটি বার্তা পাঠান। সেখানে তিনি আগের বার্তাগুলো দেখতে এবং শাড়িটি ফেরত দিতে বলেন। একই সঙ্গে তাকে হুমকি দেওয়ার প্রয়োজন নেই বলেও উল্লেখ করেন।

জবাবে ১০ নভেম্বর তিশা মেসেঞ্জারে বাদীকে ব্যক্তিগত সমস্যা ও পেশাগত বিষয় আলাদা রাখার অনুরোধ করেন। তিনি তাদের একসময় ভালো সম্পর্ক থাকার কথা উল্লেখ করে জানান, শাড়ির বিষয়ে তার লোকজন ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছে এবং বাদীর লোকজন যেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ওই বার্তার পর বাদী ১২ নভেম্বর গুলশান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে বিষয়টি জানতে পেরে তিশা গুলশান থানা পুলিশের মাধ্যমে শাড়িটি ফেরত দিতে চাইলেও বাদী তা গ্রহণ না করে মামলা করেন।

পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তকালে তানজিন তিশাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি জানান, বাদীর সঙ্গে তার একসময় খুব বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল এবং এর আগে বাদীর কাছ থেকে আরও শাড়ি নিয়ে পরার পর সেগুলো ফেরত দিয়েছেন। এসব শাড়ির বিনিময়ে তিনি কোনো টাকা নেননি বলেও জানান।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন বিষয়টি নিয়ে কোনো কথা না হওয়ায় তিশা শাড়িটির কথা ভুলে গিয়েছিলেন। তার আগের ড্রাইভার শাড়িটি ফেরত না দিয়ে চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়ায় বিষয়টি জটিল হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন মাধ্যমে বাদীর ঠিকানা জানার চেষ্টা করেও তা পাওয়া যায়নি বলে তিশা তদন্ত কর্মকর্তাকে জানান।

মামলার বিষয়টি জানার পর তিশা ডাকযোগে শাড়িটি ফেরত পাঠান। নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ তিনি শাড়িটি ডাকযোগে ফেরত পাঠান। তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে বলেন, বাদীকে নোটিশ দিয়ে এবং তদন্তের সময় সরাসরি ও মোবাইল ফোনে মামলার অভিযোগের পক্ষে দালিলিক সাক্ষ্য-প্রমাণ দিতে বলা হলেও তিনি কোনো দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। অন্যদিকে তিশা শাড়িটি ফেরত পাঠিয়েছেন। এ কারণে শাড়ি নিয়ে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে তদন্ত কর্মকর্তা মত দেন।

হুমকির অভিযোগের বিষয়েও তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর তিশার পাঠানো মেসেজের শেষাংশে শাড়িটি ফেরত দেওয়ার ঠিকানা জানতে চাওয়া এবং বাদীর সুন্দর জীবন কামনা করা হয়েছিল। ফলে ওই বার্তার মাধ্যমে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও প্রমাণিত হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সবশেষে তদন্ত কর্মকর্তা জানান, মামলার বাদী ও বিবাদীকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তদন্তে প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে বাদীর আনা অভিযোগের বিষয়ে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়নি।