২৫০ ব্যক্তির গুমের রহস্য যেভাবে উদঘাটন করছে তদন্ত সংস্থা
সেসব তথ্য চিহ্নিত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
আগামী এক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করার আশা করছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট ক্ষমতায় আসে।
পরবর্তী সময়ে বিচারের জন্য ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সাংগঠনিকভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে বিএনপির ১৫৩ জন এবং ‘মায়ের ডাক’-এর ১৫০ জনের বিষয়ে দেওয়া অভিযোগ উল্লেখযোগ্য।
তবে বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের তিনটি মামলার বিচার অব্যাহত রয়েছে। এ অবস্থায় সরকার গুম প্রতিরোধবিষয়ক একটি আইন করতে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। আগামী সংসদে এটি উত্থাপিত হবে বলে আইনমন্ত্রীর মাধ্যমে জানতে পেরেছি। খসড়াটি ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হয়েছে।
আইনের খসড়ায় গুমের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর তার পরিচয় গোপন করলে, তার অবস্থান সম্পর্কে অবহিত না করলে, ওই ব্যক্তির বিষয়ে কোনো তথ্য না দিলে বা আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ না দিলে এবং এ ধরনের কৌশলে তাকে অজ্ঞাত স্থানে আটক করে রাখলে সেটি গুম হিসেবে গণ্য হবে।
এই আইনে গুমকে একটি স্বতন্ত্র অভিযোগ ও স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দায়রা আদালতে এর বিচার হবে এবং সাজা বাড়িয়ে যাবজ্জীবন পর্যন্ত করার বিধান রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের বিচার প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, কোনো গুমের ঘটনা যদি ‘ওয়াইডস্প্রেড অ্যান্ড সিস্টেমেটিক’ বা ব্যাপক ও পরিকল্পিত অপরাধের অংশ হয় এবং একই ধরনের প্যাটার্নে সংঘটিত হয়, তাহলে সেটি মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় গুমের অনেক অভিযোগ রয়েছে। ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬’-এর বিষয়টি মাথায় রেখে আপাতত ২৫০ জনের গুমের অভিযোগকে অগ্রাধিকার দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে সাজেদুল ইসলাম সুমন, ইলিয়াস আলীসহ অনেকেই রয়েছেন।
আড়াইশ ব্যক্তির গুমের প্যাটার্ন একই জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এখন পর্যন্ত ওই ২৫০ ব্যক্তি বেঁচে আছেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাদের প্রত্যেককে একই ধরনের পদ্ধতিতে অপহরণ ও গুম করা হয়েছে। রাস্তায় আটক করে নিয়ে যাওয়া, বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া কিংবা চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা রয়েছে। অপহরণের ক্ষেত্রে মাইক্রোবাস ব্যবহার করা হয়েছে। কেউ প্লেইন ড্রেসে, আবার কেউ পোশাক পরা অবস্থায় এসেছেন। তাদের তুলে নেওয়ার পর অবস্থান ও সন্ধানসংক্রান্ত তথ্য গোপন রাখা এবং পরে অস্বীকার করার ঘটনাও ঘটেছে। তিনি বলেন, এই ২৫০ জনের অপহরণ ও গুমের প্যাটার্ন একই এবং তা সারা বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে সংঘটিত হয়েছে। ২৫০ জনের ঘটনা স্বতন্ত্র গুম নয়। এটি ওয়াইডস্প্রেড অ্যান্ড সিস্টেমেটিক অফেন্স, যা এই ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আমরা চিহ্নিত করেছি।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তদন্ত চলছে। এরই মধ্যে ২৫০ ব্যক্তির প্রত্যেককে কোথা থেকে, কোন তারিখে ও কীভাবে তুলে নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে এবং অনেকের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে। যেসব আলামত পাওয়া গেছে, তার মধ্যে কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজও রয়েছে। সেগুলো জব্দ করা হয়েছে। ২৫০ গুমের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী কথা বলছে রাষ্ট্রপক্ষ। ধারাবাহিকভাবে তাদের বক্তব্য নেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, একাধিকবার ২৫০ গুম পরিবারের সদস্যদের গণশুনানি নেওয়া হয়েছে। গত ২৫ আগস্ট প্রায় ৬০ জন গুম পরিবারের সদস্য এসেছিলেন। তাদের মধ্যে আগে আসেননি এমন ব্যক্তিরাও ছিলেন। তাদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। আগামী ৬ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায় আবারও তাদের শুনানি ও বক্তব্য নেওয়া হবে।
তদন্তে দেরি হওয়ার বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। ফলে এটি একটি সময়সাপেক্ষ তদন্ত। পাশাপাশি তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপহরণের পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসাবধানতাবশত কিছু তথ্য বা প্রমাণ রেখে গেছে, যা তদন্ত সংস্থা সংগ্রহ করছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তথ্য-প্রমাণ গোপন করা হয়েছে। এ কারণে সিডিআর, ভিডিও ফুটেজসহ ডিজিটাল এভিডেন্সের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। পাশাপাশি অনেক বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তও করতে হচ্ছে।
তিনি জানান, গুমের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পাঁচজন তদন্ত কর্মকর্তা কাজ করছেন। চিফ প্রসিকিউটরসহ কয়েকজন প্রসিকিউটর সরাসরি তদন্তের তদারকি করছেন। একটি দল ইতোমধ্যে বিভিন্ন ঘটনার স্থনা (পিও) পরিদর্শন করছে। সেখানে ঘটনাস্থলের মানচিত্র তৈরির কাজও চলছে।
২৫০ জনের গুমের মামলা আলাদা আলাদা না করে সবগুলো একসঙ্গে একটি মামলায় বিচারের চিন্তা করছে রাষ্ট্রপক্ষ।
এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে সম্ভব হলে ২৫০ জনের গুমের ঘটনা নিয়ে একটি মামলা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে চার্জ ভিন্ন হবে, কাউন্ট ভিন্ন হবে। প্রত্যেক পরিবারের জন্য আলাদা আলাদা চার্জ থাকবে এবং আলাদা আসামির পরিচয় থাকবে। তবে সবগুলোকে একটি ট্রায়ালে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে সময় বাঁচে, তদন্ত দ্রুত শেষ করা যায় এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান চিফ প্রসিকিউটর।








আপনার মতামত লিখুন