নেপালে টানেলে শত শত শ্রমিক নিখোঁজ, পাহাড়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে উদ্ধারের চেষ্টা

নেপালে টানেলে শত শত শ্রমিক নিখোঁজ, পাহাড়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে উদ্ধারের চেষ্টা
১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৯ পিএম

নেপালের ত্রিশূলী নদীর তীরে কাদায় ভরা বিশাল টানেল নেটওয়ার্কের ভেতরে শত শত শ্রমিক আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর এসব টানেলে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে পাহাড়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পথ তৈরির পাশাপাশি ভেতরে বাতাস পাঠানোর চেষ্টা করছেন উদ্ধারকারীরা।

বিবিসি নেপালির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদীর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ৯০০ জনের বেশি কর্মী গত বুধবারের বন্যার পর থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছেন বলে কর্মকর্তারা সন্দেহ করছেন। তবে টানেলের ভেতরে ঠিক কতজন আটকা পড়েছেন, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজরাম বসনেত জানিয়েছেন, সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত রাসুওয়াগাধি, লাংটাং, চিলিমে, আপার ত্রিশুলি ৩এ এবং আপার ত্রিশুলি ৩বি এলাকায় উদ্ধার অভিযান চলছিল।

ত্রিশুলি ৩এ প্রকল্প এলাকায় পাহাড়ের ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পথ তৈরির কাজ চলছে। একই সঙ্গে টানেলের ভেতরে বাতাস পাঠানো হচ্ছে। উদ্ধারকারীদের আশঙ্কা, জীবিত শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোর গুরুত্বপূর্ণ সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।

৩৩ বছর বয়সী প্রকৌশলী অরুস ভান্ডারি প্রকল্প এলাকায় নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর স্ত্রী অনুশিলা ভান্ডারি বলেন, তাকে যদি খুঁজে পাওয়া যেত। তিনি চান, তাঁর স্বামী জীবিত অবস্থায় বাড়ি ফিরে আসুন।

এদিকে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯৫৫ হয়েছে। এর মধ্যে নেপালে ৯৩৯ জন এবং তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নিখোঁজ মানুষের সংখ্যাও সংশোধন করে ৩ হাজার ৯২৫ করেছে। তাঁদের মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক।

নিখোঁজদের মধ্যে আনুমানিক প্রতি সাতজনের একজন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী বলে ধারণা করা হচ্ছে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, প্রকল্প এলাকাগুলো থেকে এখন পর্যন্ত ২৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত মোট ১১ হাজার ৩৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।

চীনা ও নেপালি সামরিক সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক দল উদ্ধার অভিযানে কাজ করছে। ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞরাও এতে সহায়তা করছেন।

জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ করা এক নিখোঁজ ব্যক্তির স্ত্রী সিতা পাণ্ডে নেপালের দৈনিক কান্তিপুরকে বলেছেন, তাঁর এখনও ৫০ শতাংশ আশা আছে যে তাঁর স্বামী বেঁচে আছেন, কারণ টানেলের ভেতরে অক্সিজেনের ব্যবস্থা রয়েছে।

উদ্ধারকারীরা সপ্তাহের শেষ দিকে একটি টানেলে বাতাস পাম্প করা শুরু করেন। তবে আটকে থাকা শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, কাজটি আরও আগেই করা উচিত ছিল।

সোমবার সকালে একটি দল একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে যাওয়া একটি টানেলে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু সেখানে কাউকে না পেয়ে তারা ফিরে আসে।

আটকে থাকা এক ব্যক্তির স্বজন জীবন খড়কা বলেন, যত বেশি সময় যাচ্ছে তাঁদের আশা ততই কমে যাচ্ছে। উদ্ধার অভিযান আরও দ্রুত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁদের কাছে প্রতিটি সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ।

আরেক স্বজন প্রিয়া খারেল তাঁর ভাই মিলানের খবরের জন্য অপেক্ষা করছেন। বন্যার সময় মিলান ত্রিশূলী ১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছিলেন। প্রিয়া বলেন, জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, টানেলের ভেতরে মানুষ ছিল। তাই দ্রুত তাদের কাছে পৌঁছাতে পারলে বাঁচানো সম্ভব বলে তিনি আশা করছেন।

অস্ট্রেলিয়ান প্রকৌশলী আর্নল্ড ডিক্স দূর থেকে নেপালি কর্তৃপক্ষকে ভূগর্ভস্থ অনুসন্ধান অভিযানে সহায়তা করছেন। তিনি জানিয়েছেন, উদ্ধারকারীরা টানেলগুলোর অবস্থান শনাক্ত করতে সমস্যায় পড়ছেন।

বিবিসি রেডিও ৪-এর ওয়ার্ল্ড অ্যাট ওয়ান অনুষ্ঠানে ডিক্স বলেন, টানেলগুলোর প্রকৃত চিহ্নই হারিয়ে গেছে। পুরো এলাকাটি যেন চাঁদের পৃষ্ঠের মতো হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অবস্থান শনাক্ত করা গেলে সেখানে পৌঁছানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। সাধারণত এ জন্য খনন এবং বড় বড় পাথরে বিস্ফোরণ ঘটাতে হয়।

ডিক্স বলেন, সেখানে এমন পাথর রয়েছে যেগুলো বাড়ির চেয়েও বড়। তবে ভূগর্ভে আটকে থাকা মানুষদের নিয়ে তিনি কিছুটা আশাবাদী। কারণ ওপরের প্রবল বন্যার ধাক্কা থেকে ভূগর্ভস্থ পরিবেশ তাঁদের কিছুটা সুরক্ষা দিয়ে থাকতে পারে।

এদিকে বন্যার মূল আঘাতের স্থান থেকে অনেক দূরে ভাটির দিকে অবস্থিত চিতওয়ান জেলায় অস্থায়ীভাবে মৃতদেহ দাফন করা হচ্ছে। হিমালয় অঞ্চলের নদীগুলো দিয়ে প্রায় ৩০০ মৃতদেহ ভেসে এসে ওই এলাকার তীরে জমা হয়েছে।

শনাক্ত করা যায়নি এমন মৃতদেহগুলো শনাক্ত করতে চিকিৎসাকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরা ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করছেন। জেলা প্রধান কর্মকর্তা গণেশ আরিয়াল জানিয়েছেন, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মৃতদেহ শনাক্ত হওয়ার পর স্বজনেরা তাঁদের প্রিয়জনের মরদেহ ফেরত নিতে পারবেন।

তিনি বলেন, পর্যাপ্ত ফ্রিজার না থাকায় অস্থায়ীভাবে দাফন করাই ছিল শেষ বিকল্প। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে কর্তৃপক্ষও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

তিব্বতে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১৬ এবং নিখোঁজের সংখ্যা ৫৪৬ বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।

চীনে বন্যার ভিডিও ব্যাপকভাবে সেন্সর করা হয়েছে। সরকারি হিসাবের চেয়ে মৃতের সংখ্যা বেশি বলে অনলাইনে কেউ অনুমান করলে চীনা কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। এসব ব্যবস্থার মধ্যে সতর্কবার্তা, জরিমানা এবং অল্প সময়ের জন্য আটকে রাখার মতো পদক্ষেপ রয়েছে।

নেপালেও বন্যা নিয়ে যেসব অনলাইন কনটেন্টকে ভুল তথ্য বা গুজব হিসেবে মনে করছে কর্তৃপক্ষ, সেগুলো সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা