ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক
ব্যক্তিবিশেষের কারণে টানাপোড়েন কাম্য নয়
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের জনগণের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের আত্মিক সম্পর্ক। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতা এ দেশের মানুষ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে। স্বাধীনতার পরও নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়েছে। কখনো ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে, কখনো দেখা দিয়েছে মতপার্থক্য ও টানাপোড়েন। তবে দুই দেশের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থেই সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি অটুট রাখা জরুরি।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এখন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর ভারতে অবস্থান ভারতের জন্য যেমন কূটনৈতিক অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছে, তেমনি বাংলাদেশের সঙ্গেও সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান বা কর্মকাণ্ড যেন কোনোভাবেই দুই রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে অপ্রয়োজনীয় জটিলতার দিকে ঠেলে না দেয়—এ বিষয়টি উভয় দেশের নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের সঙ্গে একটি মানবিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও জড়িত। ১৯৭৫ সালের আগস্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার সময় তাঁর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনা ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন এবং ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত প্রায় ছয় বছর সেখানে অবস্থান করেন। সেই সময় তাঁর নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের বিষয়টি ছিল অত্যন্ত মানবিক এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। ভারত তখন যে সহযোগিতা করেছিল, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। ভারত সরকার তাঁর নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে তাঁকে আশ্রয় দিয়েছে—এমন অবস্থান দিল্লির পক্ষ থেকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। ভারতের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁকে ‘তখনকার মতো’ নিরাপত্তার স্বার্থে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যে অবস্থানকে সাময়িক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল, সেটি দীর্ঘ দুই বছর অতিক্রম করেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি এখন শুধু মানবিক আশ্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে ভারতে অবস্থান করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শেখ হাসিনার সম্পৃক্ততা নিয়ে। ভারত সরকার একাধিকবার বলেছে, শেখ হাসিনা ব্যক্তিগত সক্ষমতায় কোনো বক্তব্য বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হলে তার দায় ভারতের নয়। ‘ইনডিভিজুয়াল ক্যাপাসিটি’তে তাঁর কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে—এমন ব্যাখ্যাও ভারত দিয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁর বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ভারতের কোনো সম্পর্ক নেই—এটি দিল্লির ঘোষিত অবস্থান।
তবে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে শুধু আনুষ্ঠানিক অবস্থানই সব সময় শেষ কথা নয়। একজন সাবেক সরকারপ্রধান যখন অন্য একটি দেশে অবস্থান করেন এবং সেখান থেকে নিজের দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই আশ্রয়দাতা দেশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে যদি সেই বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশে প্রভাব ফেলে, তাহলে বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
৫ আগস্টের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে শেখ হাসিনার অনলাইনে সরাসরি সংবাদ সম্মেলনে যুক্ত হওয়ার ঘটনাটি এ কারণেই বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে ভারতের কাছে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছে। ভারত সরকার তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে নিজেদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে অবস্থান স্পষ্ট করলেও বাংলাদেশের মানুষের একটি অংশের মধ্যে এ নিয়ে প্রশ্ন ও অস্বস্তি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন—বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার বাংলাদেশের জনগণ ও বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর। একইভাবে ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তা ও মানবিক বিবেচনায় কাউকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও ভারতের রয়েছে। কিন্তু কোনো দেশের মাটিকে ব্যবহার করে অন্য দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হলে সেটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানোর দায়িত্ব আশ্রয়দাতা দেশ এবং আশ্রয়প্রার্থী—উভয়েরই।
দুই দেশের সম্পর্ক কোনো একক ব্যক্তি বা একটি রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং অভিন্ন স্বার্থে সহযোগিতা। ব্যক্তি ও দল পরিবর্তিত হবে, রাজনৈতিক সরকারও পরিবর্তিত হবে; কিন্তু প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী। তাই সাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কারও জন্যই কাম্য নয়।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত, নদীর পানি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, নিরাপত্তা, অভিন্ন নদী, পরিবেশ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও মানুষের যাতায়াতের মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা দুই দেশের জনগণের জন্যই লাভজনক। একই সঙ্গে সীমান্তে প্রাণহানি, পানি বণ্টন বা বাণিজ্য ভারসাম্যের মতো বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে যে মতপার্থক্য রয়েছে, সেগুলো সমাধানের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ। কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে এসব বৃহত্তর স্বার্থ যেন আড়ালে পড়ে না যায়।
বাংলাদেশের দিক থেকেও দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে আবেগের বদলে বাস্তবতা, জাতীয় স্বার্থ ও পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হবে। একইভাবে ভারতেরও বাংলাদেশের জনগণের মনোভাব ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটকে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের স্থায়ী সংকটে পরিণত করা কারও জন্যই শুভ নয়।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালতে যেসব বিচারিক প্রক্রিয়া ও রায় হয়েছে, সেগুলোর নিজস্ব আইনগত ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। ভারত এসব বিষয়ে কী অবস্থান নেবে, সেটি তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে একজন দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান যদি দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত কূটনৈতিক অস্বস্তি সৃষ্টি করে, তাহলে বিষয়টির একটি বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে আবেগ নয়, কূটনৈতিক বিচক্ষণতা এবং দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের গুরুত্ব কোনোভাবেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। অন্যদিকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক যোগাযোগ ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সম্পর্কের মধ্যে সাময়িক মতপার্থক্য থাকলেও তা যেন বৈরিতায় রূপ না নেয়, সেটি নিশ্চিত করা উভয় দেশের দায়িত্ব।
দিল্লির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে—বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করা এবং কোনো ব্যক্তিবিশেষের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে জটিল না করা। একইভাবে ঢাকারও উচিত ভারতের সঙ্গে সব বিষয়ে খোলামেলা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা। প্রকাশ্য পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পরিবর্তে পর্দার আড়ালের কার্যকর কূটনৈতিক আলোচনাই অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারে।
দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের চেয়েও পুরোনো ও গভীর। রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তন হতে পারে, নেতার পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতকে পাশাপাশি থাকতেই হবে। তাই কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে এই সম্পর্কের মৌলিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করা বিচক্ষণতার পরিচয় হবে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের কাছে বাংলাদেশের প্রত্যাশা হওয়া উচিত—তারা যেন মানবিক বিবেচনা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করে। একই সঙ্গে বাংলাদেশকেও এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়, যাতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংযম ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই এ সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা সম্ভব।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক শুধু দুই সরকারের সম্পর্ক নয়; এটি দুই দেশের কোটি কোটি মানুষের সম্পর্ক। ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে এ সম্পর্কের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই একজন ব্যক্তি বা একটি রাজনৈতিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে সেই সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি দুর্বল হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সময়ের প্রয়োজনে ঢাকা ও দিল্লিকে আরও পরিণত ও দায়িত্বশীল কূটনীতির পরিচয় দিতে হবে। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়ে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তার একটি গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করা জরুরি। ভারতের উচিত বাংলাদেশের উদ্বেগকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা এবং বাংলাদেশেরও উচিত বিষয়টি নিয়ে দায়িত্বশীল কূটনৈতিক পথ অনুসরণ করা।
ব্যক্তিবিশেষের কারণে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন কোনোভাবেই কাম্য নয়। বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্ব, পারস্পরিক স্বার্থ এবং দুই দেশের জনগণের কল্যাণই হওয়া উচিত সব সিদ্ধান্তের মূল বিবেচনা। দিল্লির সুবুদ্ধি ও সুবিবেচনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি ঢাকারও প্রয়োজন সংযম, বাস্তববাদ ও দূরদর্শিতা।








আপনার মতামত লিখুন